ইংরেজিতে Folklore শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ 'লোকসাহিত্য' বলতে জনসাধারণের মুখে মুখে প্রচলিত গান, কাহিনী, গল্প, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদি বোঝানো হয়। সাধারণত কোনো সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর অলিখিত সাহিত্যই লোকসাহিত্য।
Related Question
View Allচর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ সম্বন্ধে জানার প্রধান অবলম্বন হলো চর্যাপদ। বহু বাংলা শব্দের বিবর্তনের ধারা খুঁজে পেতে এই গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা কবিতার মধ্যে যে অন্ত্যমিল লক্ষ করা যায়, তার উৎসও বলা যায় চর্যাপদকে। চর্যাপদে ব্যবহৃত কিছু প্রবাদ ও রূপকল্প পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। এসব কারণে চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে লেখক বড়ু চণ্ডীদাস তৎকালীন গ্রামীণ জীবনের পরিচয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কাব্যের ১৩টি খণ্ডের নামকরণের মধ্যেই তৎকালীন গ্রামীণ জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। যেমন: তাম্বুল, নৌকা, বৃন্দাবন, বংশী, যমুনা খণ্ড। অর্থাৎ পান, নৌকা, বন, বাশি স্বাভাবিকভাবেই গ্রামীণ জীবনেরই অনুষঙ্গ। এছাড়া কৃষ্ণ-রাধা ও বড়াই চরিত্রের মধ্যেও গ্রামীণ মানুষের স্বভাব বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। রাধাকে ভোগ করার জন্য কৃষ্ণ বুড়িকে ঘুষ হিসেবে পান দেওয়া, রাধার লাকড়ি দিয়ে রান্না, কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রান্না নষ্ট হওয়া, মথুরা হাটে দুধ বিক্রি করা, কৃষ্ণের মাঝিরূপে গোপীগণকে নদী পার করা, পথে রাধাকে আটক করে জোরপূর্বক কৃষ্ণের ভোগ ইত্যাদিসহ গ্রামীণ জীবনের অনেক প্রসঙ্গ এই কাব্যে উঠে এসেছে। কৃষ্ণকে অশিক্ষিত, অমার্জিত, গ্রাম্য, এবং বড়ায়িকে গ্রাম্য কুট্টনী বলে অনেক সমালোচক অভিহিত করেছেন। হাটকেন্দ্রিক অর্থনীতিও গ্রামীণ জীবনে দেখা যায় আর যা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে ফুটে উঠেছে। মথুরা হাটে রাধা দুধ বিক্রি করতে যায় পথে কৃষ্ণ রাধার দুগ্ধদধির পসার নষ্ট করে। প্রতিশোধ নিতে রাধা কৃষ্ণকে দিয়ে ছাত্র বা ছাতা ধরায় এবং দুধের পসার বহন করায়। তাছাড়া গ্রামীণ জীবনের খণ্ড খণ্ড চিত্রও এ কাব্যে সংযোজিত হয়েছে। গোপ, কুমার, তেলী, নাপিত ইত্যাদি শ্রেণি পেশাজীবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যাদুটোনা, বান মারা, অশ্রাব্য গালি গালাজ, তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুক ইতাদি গ্রামীণ জীবন চিত্রকেই তুলে ধরে। অর্থাৎ গ্রামীণ জীবনের কথকতাই এই কাব্যে তুলে ধরেছেন লেখক বড়ু চণ্ডীদাস।
১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলির উদ্যোগে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে। বাংলা গদ্যের ধারাবাহিক এবং সুশৃঙ্খল বিকাশের প্রথম সার্থক প্রয়াস এ কলেজের মাধ্যমে হয়। ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ চালু হলে অধ্যক্ষ উইলিয়াম কেরি পণ্ডিত ও সহকারী পণ্ডিতদের নিয়ে বাংলা গদ্যে পাঠোপযোগী বই রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৮০১ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে আটজন লেখকের ১৩ বা ১৪টি গ্রন্থ রচিত হয়। তাদের মধ্যে উলে-খযোগ্য লেখক ও গ্রন্থ হলো উইলিয়াম কেরির কথোপকথন (১৮০১), রামরাম বসুর রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) এবং লিপিমালা (১৮০২), মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২), হিতোপদেশ (১৮০৮) ও রাজাবলি (১৮০৮), এবং চণ্ডীচরণ মুনশীর তোতা ইতিহাস। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের জড়ত্ব মুক্তি ঘটে, গদ্য শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় এবং ইতিহাস ও গল্প রচনায় সাফল্যের পাশাপাশি অনুবাদ সাহিত্যে দক্ষতা প্রকাশ পায়।
বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান যেমন অপরিসীম তেমনি সমাজ সংস্কারেও বিদ্যাসাগরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিদ্যাসাগরের সাহিত্য সাধনার পশ্চাতে সমাজসেবকের মনোবৃত্তি কার্যকর ছিল। তিনি ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ, ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তিনি বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেছেন, বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য সর্বস্ব পণ করেছিলেন এবং নিজের আদর্শকে চিরদিন সমুন্নত রেখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সম্পর্কিত প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে 'বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব এবং বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার' উল্লেখযোগ্য। হিন্দু সমাজের আবহমানকালের অনুসৃত হৃদয়বিদারক অনাচারগুলো বিদ্যাসাগরের মনকে সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল। তাঁর রচনাবলিতে সে নিদর্শন বিদ্যমান। সাহিত্য ও সমাজকর্ম-এ দুটি বিষয়েই বিদ্যাসাগরের রয়েছে সরব পদচারণা। সাহিত্যের খ্যাতি যেমন তাকে প্রসিদ্ধ করেছে তেমনি সমাজসংস্কারের অদম্য প্রচেষ্টা তাকে সমাজ সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত করেছে। তবে বিদ্যাসাগর মূলত সমাজ সংস্কারক হিসেবেই বাঙালি সমাজে অবিস্মরণীয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!